কাশ্মীরের ইতিহাস

 কাশ্মীরের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল এবং বহুস্তরীয়, যেখানে বিভিন্ন রাজবংশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংঘাতের মিশেল রয়েছে।

কাশ্মীরের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল এবং বহুস্তরীয়, যেখানে বিভিন্ন রাজবংশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংঘাতের মিশেল রয়েছে।



🔳প্রাচীন যুগ (খ্রিস্টপূর্ব যুগ – ১৪শ শতক):

1. প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসন:  

   - কাশ্মীর উপত্যকা হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবাধীন ছিল। মহাকাব্য মহাভারত-এ কাশ্মীরের উল্লেখ আছে (তৎকালীন নাম কাশ্যপমীর)।

   - মৌর্য সম্রাট অশোক (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক) কাশ্মীরে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন। পরে কুষাণ সাম্রাজ্য (১ম–৩য় শতক) ও হিন্দু শাহী রাজবংশ (৭ম–১১শ শতক) শাসন করে।


2. কarkoṭa ও উৎপল রাজবংশ:  

   - ললিতাদিত্য মুক্তাপিদ (৮ম শতক) কাশ্মীরের সবচেয়ে শক্তিশালী হিন্দু রাজা ছিলেন, যিনি মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।

   - ১০ম শতকে শৈব ধর্ম (হিন্দুধর্মের একটি শাখা) কাশ্মীরে প্রাধান্য পায়।


🔳মধ্যযুগ (১৪শ–১৯শ শতক): মুসলিম শাসন

1. শাহ মীর রাজবংশ (১৩৩৯–১৫৬১):  

   - শাহ মীর (রিনচন নামে পরিচিত, একজন বৌদ্ধ ধর্মান্তরিত মুসলিম) প্রথম মুসলিম শাসক হন এবং সুলতান সদরউদ্দিন নাম নেন।

   - কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটে, তবে হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ও টিকে থাকে।


2. মুঘল শাসন (১৫৮৬–১৭৫২):  

   - সম্রাট আকবর ১৫৮৬ সালে কাশ্মীর দখল করেন এবং এটিকে মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ করেন।

   - মুঘলরা শিমলা, শ্রীনগরে মোগল গার্ডেন (শালিমার বাগ) নির্মাণ করে এবং কাশ্মীরকে "স্বর্গบน земле" বলে প্রশংসা করে।


3. আফগান ও শিখ শাসন (১৭৫২–১৮৪৬):  

   - ১৭৫২ সালে আফগান দুররানি সাম্রাজ্য কাশ্মীর দখল করে, কিন্তু তাদের শাসন নিষ্ঠুর ছিল।

   - ১৮১৯ সালে শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিং কাশ্মীর জয় করেন এবং শিখ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।


🔲আধুনিক যুগ (১৮৪৬–১৯৪৭): ডোগরা শাসন ও ব্রিটিশ উপনিবেশ

1. ডোগরা রাজবংশ (১৮৪৬–১৯৪৭):  

   - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি -এর সাথে শিখদের যুদ্ধের পর, ১৮৪৬ সালে অমৃতসর চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশরা গুলাব সিং -কে ৭৫ লক্ষ ন্যানাক শাহি রূপির বিনিময়ে কাশ্মীর বিক্রি করে দেয়। তিনি হিন্দু ডোগরা রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।

   - ডোগরা শাসনামলে কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ নানান নিপীড়নের শিকার হয়, যা পরবর্তীতে বিদ্রোহের জন্ম দেয়।


🔳ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব (১৯৪৭–বর্তমান)

1. ১৯৪৭: বিভাজন ও যুদ্ধ:  

   - ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হলে, কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং স্বাধীন থাকতে চাইলেও পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতীয়রা আক্রমণ করে। রাজা ভারতের সাথে অধিরাজ্য চুক্তি (Instrument of Accession) সই করেন (২৬ অক্টোবর ১৯৪৭)।

   - প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৯৪৭–৪৮) -এর পর কাশ্মীর দুভাগে বিভক্ত হয়:

     - ভারত-administered জম্মু ও কাশ্মীর (রাজধানী: শ্রীনগর)।

     - পাকিস্তান-administered আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান (রাজধানী: মুজাফফরাবাদ)।


2. ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধ:  

   - ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান কাশ্মীর দখলের চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয় (তাশখন্দ চুক্তি)।

   - ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কাশ্মীর ইস্যু ছিল।


3. ১৯৮৯: বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদ:  

   - ভারত-administered কাশ্মীরে পাকিস্তান-সমর্থিত বিদ্রোহ শুরু হয়, যা আজও চলছে। হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।


4. ২০১৯: বিশেষ মর্যাদা বাতিল:  

   - ভারতের সংবিধানের ধারা ৩৭০ ও ৩৫এ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করা হয় (৫ আগস্ট ২০১৯)।


🔳আন্তর্জাতিক অবস্থান

- জাতিসংঘ: ১৯৪৮ সালে ইউএনএসসি রেজোলিউশন ৪৭ পাস হয়, যা কাশ্মীরে গণভোটের কথা বলে, কিন্তু তা এখনও হয়নি।

- চীন: আকসাই চিন অঞ্চল দখল করে রেখেছে (১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর)।


🔲সংক্ষেপে বর্তমান অবস্থা

- ভারত: জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে শাসন করছে।

- পাকিস্তান: আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তানকে "মুক্ত অঞ্চল" দাবি করে।

- চীন: পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের অংশ (CPEC) ও আকসাই চিন নিয়ন্ত্রণ করে।


কাশ্মীর ইস্যু বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও অমীমাংসিত দ্বন্দ্বগুলির মধ্যে একটি, যার সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

কাশ্মীরের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল এবং বহুস্তরীয়, যেখানে বিভিন্ন রাজবংশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংঘাতের মিশেল রয়েছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি কাশ্মীর 

Comments

Popular posts from this blog

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা