গ্রাহক ঋণের টাকা ফেরত না দিলে ব্যাংক কী করে?
গ্রাহক ঋণের টাকা ফেরত না দিলে ব্যাংক সেই ঋণকে বিরুপ মানে শ্রেণীকরণ করে। ইংরেজিতে এই প্রক্রিয়াকে 'ক্লাসিফিকেশন' বলা হয়।
একটা বড় ঝুড়িতে অনেকগুলো ফল আছে। সেখান থেকে পঁচা ফলগুলো বেছে আরেকটা ঝুড়িতে রাখার প্রক্রিয়াকে আমরা একরকম ক্লাসিফিকেশন বলতে পারি। ব্যাংকের ক্লাসিফিকেশনও কাছাকাছি ধরনের একটা প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো নানা নামে নানা ধরনের ঋণ দেয়। এগুলো কোনোটা তলবী, কোনোটা চলমান, কোনোটা মেয়াদী।
ব্যাংকভেদে লোন প্রডাক্ট এর নানারকম নামকরণ করা হয়।
আমি একটা ব্যাংকের উদাহরণ দিই: ইউসিবি যেগুলো লোন দেয় সেগুলো হলো: Start-up financing, Home loan, Personal Ioan, Auto loan, Letter of credit, Transport loan, Construction loans, Loan syndication, Adjustable rate mortgages, Agriculture loan, Merger and acquisition, Placement agent, Working capital.
এগুলো লোনের সুন্দর সুন্দর নামকরণ আছে বিভিন্ন ব্যাংকে। গ্রাহক আকর্ষণ করার জন্য বাহারি নামের পসরা সাজিয়েছে ব্যাংকগুলো।
কিন্তু, সব লোনকে আসলে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১. তলবী ঋণ (Demand Loans): এইসব ঋণ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেয়া হয়। এগুলো ৩/৬/১২ মাস মেয়াদে মঞ্জুর করা হয়। এগুলো সাধারণত রিভলভ করেনা।
২. মেয়াদি ঋণ (Term Loans): এগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেয়া হয়। এগুলোর রিপেমেন্ট সাধারণত মাসিক/ত্রৈমাসিক কিস্তিতে আদায় করা হয়।
৩. চলমান ঋণ (Continuous Loans): এই ঋণগুলো রিভলভিং হয়। অর্থাৎ এই লোনে একটা লিমিট সেট করে দেয়া হয়। গ্রাহক সেই লিমিট এর মধ্যে লেনদেন করতে পারেন। এগুলোর মেয়াদ সাধারণত এক বছর হয়। এই লোনকে এডভান্স কিংবা ওভারড্রাফটও বলা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই তিন ভাগের মধ্যে যেকোনো এক ভাগে ফেলে সব লোনকেই।
এছাড়া আরেকটা শ্রেণী করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক- শর্ট টার্ম এগ্রিকালচার এন্ড মাইক্রো-ক্রেডিট লোন।
শ্রেণীকরণ করা হয় এই চার প্রকার ঋণের।
মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কিংবা কিস্তি না দিলে ঋণ শ্রেণিকরণ করা হয়।
মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তলবী এবং চলমান ঋণ হয় মেয়াদোত্তীর্ণ বা এক্সপায়ার্ড।
কিস্তি না দিলে মেয়াদী ঋণ হয় ওভারডিউ।
এক্সপায়ার্ড কিংবা ওভারডিউ হয়ে যাবার পর এক্সপাইরি কিংবা ওভারডিউ ডেটকে ভিত্তি ধরে ঋণকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:
এসএমএ (স্পেশাল মেনশন একাউন্ট)
এসএস (সাব-স্ট্যান্ডার্ড)
ডিএফ (ডাউটফুল)
বিএল (ব্যাড/লস)
চলমান ঋণ
মেয়াদোত্তীর্ণের ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত এসএমএ
মেয়াদোত্তীর্ণের ৩ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত এসএস
মেয়াদোত্তীর্ণের ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত ডিএফ
মেয়াদোত্তীর্ণের ১২ মাস পর বিএল
তলবী ঋণ
মেয়াদোত্তীর্ণের ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত এসএমএ
মেয়াদোত্তীর্ণের ৩ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত এসএস
মেয়াদোত্তীর্ণের ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত ডিএফ
মেয়াদোত্তীর্ণের ১২ মাস পর বিএল
মেয়াদী ঋণ
৮ থেকে ৯ কিস্তি ওভারডিউ হলে এসএমএ
৯ থেকে ১৫ কিস্তি ওভারডিউ হলে এসএস
১৫ থেকে ১৮ কিস্তি ওভারডিউ হলে ডিএফ
১৮ এর বেশি কিস্তি ওভারডিউ হলে বিএল
শর্ট টার্ম এগ্রিকালচার এন্ড মাইক্রো-ক্রেডিট ঋণ
এসএমএ হয়না
১২ থেকে ৩৬ কিস্তি ওভারডিউ হলে এসএস
৩৬ থেকে ৬০ কিস্তি ওভারডিউ হলে ডিএফ
৬০ এর বেশি ওভারডিউ হলে বিএল
এসএমই সেক্টরে ঋণ বিতরণ করলে এইসব প্যারামিটার বদল হয়।
এসএমই চলমান ঋণ
মেয়াদোত্তীর্ণের ২ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত এসএমএ
মেয়াদোত্তীর্ণের ৬ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত এসএস
মেয়াদোত্তীর্ণের ১৮ থেকে ৩০ মাস পর্যন্ত ডিএফ
মেয়াদোত্তীর্ণের ৩০ মাস পর বিএল
এসএমই তলবী ঋণ
মেয়াদোত্তীর্ণের ২ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত এসএমএ
মেয়াদোত্তীর্ণের ৬ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত এসএস
মেয়াদোত্তীর্ণের ১৮ থেকে ৩০ মাস পর্যন্ত ডিএফ
মেয়াদোত্তীর্ণের ৩০ মাস পর বিএল
এসএমই মেয়াদী ঋণ
৮ থেকে ১২ কিস্তি ওভারডিউ হলে এসএমএ
১২ থেকে ২৪ কিস্তি ওভারডিউ হলে এসএস
২৪ থেকে ৩৬ কিস্তি ওভারডিউ হলে ডিএফ
৩৬ এর বেশি কিস্তি ওভারডিউ হলে বিএল
বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে অবজেক্টিভ ক্রাইটেরিয়াতেও অনেক ঋণ হিসাব শ্রেণিকরণ করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়।
ঋণ শ্রেণিকরণের সাথে ব্যাংকের আয়ের সম্পর্ক আছে। স্ট্যান্ডার্ড ঋণে ব্যাংক সুদ আরোপ করে, সেই সুদ আয়খাতে স্থানান্তর করে। এসএমএ হলেও তাই করে।
যেই মুহূর্তে কোনো ঋণ এসএস হয়ে যায়, ব্যাংক সেই ঋণের ওপর সুদ আরোপ করে কিন্তু সেই সুদ আয়খাতে নেয় না। সুদ সাসপেন্স একাউন্টে স্থানান্তর করে। ব্যাংকের আয় কমে যায়।
ডিএফ ঋণের সুদও সাসপেন্স একাউন্টে যায়।
এরপরে যখন ঋণটি বিএল মানে শ্রেণিকৃত হয়, ব্যাংক তখন সেই ঋণে সুদারোপ করা বন্ধ করে। এসময় একটা ম্যানুয়াল রেজিস্টারে এই ঋণের বিপরীতে প্রাপ্তব্য সুদের হিসাব রাখা হয়।
একটা ঋণ শ্রেণিকৃত হয়ে গেছে, তার মানে এই নয় যে, ঋণ আবার নিয়মিত করা যাবে না। গ্রাহক যেকোনো সময় আবার ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে তার হিসাবকে নিয়মিত করে ফেলতে পারেন। তখন ব্যাংক সাসপেন্স একাউন্টে রক্ষিত সুদ আয়খাতে নিতে পারে। বিএল একাউন্ট এর ক্ষেত্রে ব্যাংক ম্যানুয়াল রেজিস্টার এ রক্ষিত সুদও গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করতে পারে।
ব্যাংক তার সকল ফান্ডেড এবং নন-ফান্ডেড ঋণ হিসাবের স্থিতির বিপরীতে বছর শেষে লাভের অঙ্ক থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করে।
সঞ্চিতি হলো ভবিষ্যতে ঋণ হিসাবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আলাদা করে রাখা টাকা।
স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ১% নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ করলে সঞ্চিতির পরিমাণ হয় ০.২৫%। কনজ্যুমার ফাইন্যান্সিং করলে সঞ্চিতি ২%। ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক কিংবা স্টক ডিলারকে ঋণ দিলে নিরাপত্তা সঞ্চিতি ২%। অফ-ব্যালান্স শীট আইটেম (নন-ফান্ডেড লায়াবিলিটি) এর জন্য সঞ্চিতি ১%।
যখন ঋণ শ্রেণীকৃত হয়ে যায় নিরাপত্তা সঞ্চিতির প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়।
এসএস ঋণে সঞ্চিতি লাগে ২০%; এসএমই হলে ৫%
ডিএফ ঋণে সঞ্চিতি লাগে ৫০%; এসএমই হলে ২০%
বিএল ঋণে সঞ্চিতি লাগে ১০০% এসএমই হলেও ১০০%
ইন্টারেস্ট সাসপেন্স এবং এলিজিবল কোল্যাটারাল এর ভ্যালু প্রভিশনিং কমাতে সাহায্য করে। লোন একাউন্টের ব্যালান্স থেকে এই দুইটা বাদ দিয়ে প্রভিশন রাখতে হয়। তবে, ঋণ হিসাবের ব্যালান্স এর ন্যূনতম ১৫% প্রভিশন রাখতেই হবে।
এলিজিবল কোল্যাটারাল এর মধ্যে আছে জমি, ক্যাশ বা কোয়াসি ক্যাশ সিকিউরিটি, সহজে বিক্রিযোগ্য আইটেম ইত্যাদি।
একজন ঋণগ্রহীতা তার ব্যবসায়ের দুরাবস্থার কারণ দেখিয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে তার ঋণ হিসাব পুন:তফসিল করার আবেদন করতে পারেন।
পুন:তফসিল হলো ঋণের রিপেমেন্ট শিডিউল পুরোপুরি বদলে ফেলা কিংবা ঋণ হিসাব নতুন করে শুরু করা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা আছে। একটা ঋণ হিসাব চারবার পর্যন্ত পুন:তফসিল করা যায়। পুন:তফসিল করতে নীতিমালা মানার পাশাপাশি গ্রাহককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিতে হয়। এই পরিমাণকে ডাউন পেমেন্ট নামে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
পুন:তফসিলকৃত ঋণসমূহের শ্রেণীকরণ করার জন্য আলাদা ক্রাইটেরিয়া প্রযোজ্য হয়।
সংগত কারণে ব্যাংক কোনো গ্রাহকের সুদ মওকুফ করতে পারে। তবে, এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় আদায় নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। সুদ মওকুফ করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত আয় খাতে স্থানান্তরিত সুদ মওকুফ করা যেতোনা। এখন বেসরকারি ব্যাংক চাইলে আয় খাতে স্থানান্তরিত সুদও মওকুফ করতে পারে, সরকারি ব্যাংক পারেনা।
২০২২ সালে এস আলম এবং জেড এইচ শিকদার নিজেদের ব্যাংকে একে অন্যের আয়খাতে স্থানান্তরিত সুদ মওকুফ করান। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে সেটা এক কেলেঙ্কারির অধ্যায়। পলাতক গভর্নর আব্দুর রউফ চৌধুরী এই কেলেঙ্কারি অনুমোদন করেন।
বাংলাদেশের লোন ক্লাসিফিকেশন একসময় আন্তর্জাতিক মানদন্ডে উত্তীর্ণ ছিলো। কোভিড এর পরে বাংলাদেশ সেই মানদণ্ড থেকে সরে আসে। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে বারংবার পরিবর্তন করা হয় নিয়ম ও বিধিমালা।
ব্যাংকগুলো অনেক সময় ইচ্ছে করে অনেক মেয়াদোত্তীর্ণ, শ্রেণিকরণযোগ্য ঋণকে নিয়মিত দেখায়। এতে তাদের মুনাফা বাড়ে, প্রভিশনিং এর প্রয়োজনীয়তা কমে। এভাবে দিনের পর দিন শ্রেণীকরণ আড়াল করে রেখেছে অনেক ব্যাংক। কাগজের মুনাফা দেখিয়ে তার ওপর ট্যাক্স দিচ্ছে, শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বন্টন করছে- ব্যাংকের হেলথ খারাপ করছে।

Comments
Post a Comment