মা – প্রজাতি ভেদে বদলায় না তার ভালোবাসা

 মা – প্রজাতি ভেদে বদলায় না তার ভালোবাসা

মা – প্রজাতি ভেদে বদলায় না তার ভালোবাসা


ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে ভিমরুলের মতো এক ধরনের পোকা। অদ্ভুত চঞ্চল, কখনো দেয়ালের এক কোণে কী যেন রেখে আবার উধাও। কয়েকদিন ধরে পোকাটির গতিবিধি লক্ষ করলাম। দেখতে পেলাম, দেয়ালের সেই কোণে জমছে এক স্তূপ কাদা। এরপর পোকাটিকে আরও ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলাম। মুখে ছোট্ট এক ফোঁটা কাদা নিয়ে আসে আর দেয়ালে জমা করে।

দিনের পর দিন একই কাজ করে সেই কাদা একসময় একগুঁটে হয়ে বাসার মতো কিছুতে পরিণত হয়। গ্রামের লোকেরা এই পোকাকে বলে "কুমরে পোকা"। নামটা এসেছে সম্ভবত কাদার সঙ্গে এর সম্পর্কের কারণে। তবে এরা যে সে কাদা দিয়ে নয়, বরং বেছে বেছে উপযুক্ত কাদা খুঁজে আনে। সেই কাদায় নিজের লালা মিশিয়ে আঠালো করে নেয় এবং ঘর তৈরি করে।

কাদার স্তূপে লুকানো রহস্যঃ

পোকাটির তৈরি বাসার ভেতরটা একেবারে ফাঁপা। বাইরের দেয়ালটা এবড়ো-থেবড়ো হলেও ভেতরটা মসৃণ। কিন্তু বাইরে থেকে কোনো দরজা বা প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্ন জাগে — পোকাটি কীভাবে ভেতরে ঢোকে? ভেতরের পোকাগুলো কীভাবে শ্বাস নেয়?

এই প্রশ্নের উত্তর জানা গেল একটু বড় হয়ে। আসলে, কুমরে পোকা বাসা বানানোর সময় দেয়ালের চারপাশে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র রাখে। আমাদের খালি চোখে সেই ছিদ্রগুলো ধরা পড়ে না। এই ছিদ্রগুলো দিয়েই বাতাস প্রবেশ করে, যা ঘরের ভেতরটা ঠাণ্ডা রাখে এবং অক্সিজেনের অভাবও হতে দেয় না।

শিকারি মায়ের পরিশ্রমঃ

বাসা বানানো শেষ হলে মা কুমরে পোকা নতুন কাজে নেমে পড়ে। সে খুঁজতে থাকে শুঁয়োপোকা, মাকড়সা এবং অন্যান্য ছোট পোকা। দক্ষ শিকারির মতো সুযোগ পেলেই শিকার পোকাটির পিঠে হুল ফুটিয়ে দেয়।

ভিমরুল বা বোলতার হুলে একধরনের বিষাক্ত পদার্থ থাকে, যা শিকারকে অবশ করে ফেলে। শিকার তখন প্যারালাইজড রোগীর মতো—জীবিত কিন্তু নড়াচড়া করতে পারে না। মা কুমরে সেই অবশ শিকারগুলোকেও তার ঘরের ভেতর নিয়ে আসে এবং এক এক করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে।

অদ্ভুত মাতৃত্বঃ

শিকারগুলো সঠিকভাবে সাজিয়ে নেওয়ার পর মা পোকা ঘরের ভেতর ডিম পাড়ে। ডিম পাড়া শেষ হলে সে বেরিয়ে এসে ঘরের মুখ বন্ধ করে দেয়।

অদ্ভুত বিষয় হলো, এই বাসা মা পোকা নিজের জন্য বানায় না। বানায় তার ভবিষ্যৎ সন্তানদের জন্য। ডিম ফুটে ছানাগুলো বেরিয়ে আসে একসময়। ততদিনে বাসার চারপাশ শক্ত হয়ে গেছে।

মায়ের দেখা পায় না ছানারা। অথচ তাদের জন্য সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত — খাবার হিসেবে রাখা হয়েছে জীবিত, কিন্তু অবশ পোকাগুলো। ছানারা সেগুলো খায় আর বড় হতে থাকে।

মায়ের ত্যাগ এবং দূরত্বঃ

ধীরে ধীরে ছানারা বড় হয়। খাবারের ভাণ্ডার শেষ হওয়ার আগেই তারা এতটা শক্তি অর্জন করে যে নিজেরাই বাসার দেয়ালে ফুটো করে বাইরে বের হয়ে আসে।

কিন্তু মা তখন কোথায়?
মা হয়তো তখন কোনো পোকাশিকারি পাখি কিংবা গিরগিটির পেটে। আর যদি তেমন কিছু না-ও হয়, তবু সন্তানদের সঙ্গে তার আর দেখা হবে না। মা হয়তো নতুন বাসা বানাচ্ছে অন্য কোথাও, পরের প্রজন্মের জন্য। সন্তানরাও মাকে চিনবে না, মা-ও চিনবে না সন্তানকে।

মায়ের ভালোবাসা – চিরন্তন এক রূপঃ

মায়ের ভালোবাসা জাত, প্রজাতি বা প্রাণীভেদে কখনো বদলায় না। মানুষ হোক, পোকা হোক — মায়েরা সন্তানদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে। নিজের প্রয়োজন, নিজের অস্তিত্ব, নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেয় সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য।

অদ্ভুত এই জীবজগতে, কুমরে পোকা আমাদের এক অনন্য শিক্ষা দেয় — ভালোবাসা মানে সবসময় দেখা বা চেনা নয়, ভালোবাসা মানে ত্যাগ, শ্রম এবং নিঃস্বার্থ স্নেহ।

Comments

Popular posts from this blog

কাশ্মীরের ইতিহাস

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা