ইমান কি? কোরাআন হাসিদের আলোকে বর্ননা

 

অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং কর্মে তার প্রমাণ দেওয়া।

ইমান (ঈমান) অর্থ বিশ্বাস। ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, ইমান বলতে আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর নাজিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি, রাসূলগণের প্রতি, কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং তাকদির—ভাল-মন্দ উভয়ের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস করাকে বোঝায়।

ইসলামি শরীয়তের ভাষায় ইমানের সংজ্ঞা:

ইমান হল:
"دل سے تصدیق کرنا، زبان سے اقرار کرنا اور عمل سے اس کی تصدیق کرنا"
অর্থাৎ, অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং কর্মে তার প্রমাণ দেওয়া।

কোরআনের আলোকে ইমানের বর্ণনা:

১. সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৮৫:

"রাসূল বিশ্বাস রেখেছেন সেই সব বিষয়ে, যা তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং মুমিনগণও। তারা সবাই বিশ্বাস করে—আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি..."

২. সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৫:

"মুমিন তো তারা-ই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, তারপর কোন সন্দেহ পোষণ করে না এবং তারা নিজেদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাহে জিহাদ করে। তারাই সত্যিকার মুমিন।"

হাদীসের আলোকে ইমানের বর্ণনা:

হাদীসে জিবরাঈল (সহীহ মুসলিম):

নবী (সা.)-কে জিবরাঈল (আ.) প্রশ্ন করেছিলেন, “ইমান কী?”

তিনি উত্তরে বলেন:

"إيمان أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر وتؤمن بالقدر خيره وشره"
“ইমান হচ্ছে: আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, কিয়ামতের দিনে বিশ্বাস রাখা এবং তাকদিরে—ভাল-মন্দ সবকিছুর উপর বিশ্বাস রাখা।”
(সহীহ মুসলিম: ৮)


ইমান মানে কেবল মুখের কথা নয়—এটি হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস, মুখের স্বীকারোক্তি এবং কর্মের প্রমাণ। ইমান ছাড়া ইসলামের ভিত্তি পূর্ণ হয় না।

এবার আমরা ইমানের বিস্তারিত দিকগুলো নিয়ে ব্যাখ্যা করবো—যা একজন মুসলিমের জন্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

১. ইমান ও ইসলাম এর পার্থক্য:

ইমান হলো—হৃদয়ের বিশ্বাস।
ইসলাম হলো—সে বিশ্বাস অনুযায়ী বাহ্যিক কর্ম (যেমন: সালাত, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি)।

  • ইমান ছাড়া ইসলাম অকার্যকর।
  • ইসলাম ছাড়া ইমান অসম্পূর্ণ।

দৃষ্টান্ত: একজন মানুষ মনে মনে বিশ্বাস করলেও যদি সে সালাত না পড়ে বা রোজা না রাখে, তবে সে ফাসিক হবে। কিন্তু কেউ বাহ্যিকভাবে ইসলাম মানে (যেমন নামাজ পড়ে), কিন্তু হৃদয়ে বিশ্বাস না করে—তবে সে মুনাফিক হবে।

২. ইমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায়:

ইমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি বৃদ্ধি ও হ্রাস পায়

প্রমাণ:
সূরা আল-আনফাল, আয়াত ২:

"মুমিন তো তারা, যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে কাঁপে এবং যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ইমান বৃদ্ধি পায়।"

ইমান বৃদ্ধি পায়:

  • আল্লাহর স্মরণে
  • কুরআন তিলাওতে
  • নেক আমল করতে করতে

ইমান হ্রাস পায়:

  • গুনাহ করতে করতে
  • আল্লাহকে ভুলে গেলে
  • নেক আমল পরিত্যাগ করলে

৩. ইমানের শাখা:

হাদীসে এসেছে,
"ইমানের শাখা ৭০-এর অধিক বা ৬০-এর অধিক"
(সহীহ মুসলিম)

ইমানের তিনটি স্তর:

১. হৃদয়ের কাজ — যেমন: আল্লাহকে ভালোবাসা, ভয়, তাকওয়া ইত্যাদি
২. জবান/মুখের কাজ — যেমন: কালেমা পাঠ, কুরআন তিলাওয়াত
৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ — যেমন: সালাত আদায়, দান-সদকা, পিতা-মাতার সেবা

সবচেয়ে উঁচু শাখা: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলা
সবচেয়ে নিচু শাখা: রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো

৪. ইমান এবং নিফাক (মুনাফিকির পার্থক্য):

  • মু’মিন: অন্তরে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলামে বিশ্বাসী
  • মুনাফিক: বাহ্যিকভাবে ইসলাম মানে, কিন্তু অন্তরে কুফর
  • কাফের: প্রকাশ্যে ও অন্তরে ইসলাম অস্বীকারকারী

সারসংক্ষেপে:

ইমান হলো ইসলামের ভিত্তি। এটি কেবল মুখে স্বীকার নয়, বরং হৃদয়ে বিশ্বাস ও তা অনুযায়ী জীবনে চলার নাম। এ বিশ্বাস যত দৃঢ় হবে, তত বেশি মানুষ আল্লাহর নিকট প্রিয় হবে।


Comments

Popular posts from this blog

কাশ্মীরের ইতিহাস

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা