চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং টার্মিনাল নিয়ে বিতর্ক: বিদেশী বিনিয়োগ নাকি 'লুটেরা' ব্যবস্থার অবসান?
বিবিসি বাংলার জন্য প্রতিবেদন:
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং টার্মিনাল নিয়ে বিতর্ক: বিদেশী বিনিয়োগ নাকি 'লুটেরা' ব্যবস্থার অবসান?
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, "বন্দর বিদেশীদের হাতে বিক্রি" করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আন্তর্জাতিক টেন্ডারের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অংশ এবং স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া আধিপত্য ও দুর্নীতির ইতিহাসের অবসান ঘটানোর উদ্যোগ।
🔳কী ঘটছে?
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের "ডিপি ওয়ার্ল্ড"। গত কয়েক বছর ধরে এ টার্মিনালটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান "সাইফ পাওয়ারটেক" পরিচালনা করলেও সম্প্রতি আন্তর্জাতিক টেন্ডারে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠন "বন্দর বিক্রি"র অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করছে।
🔳সাইফ পাওয়ারটেকের ইতিহাস: দুর্নীতি ও ঋণের বোঝাঃ
সরকারি তথ্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে সাইফ পাওয়ারটেক চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালে কাজ পেতে বিতর্কিত টেন্ডার প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং নিয়ম-কানুন পরিবর্তনের অভিযোগের মুখে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:
- ২০০৬ সালে সর্বনিম্ন দর দেওয়া সত্ত্বেও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসকে বাদ দিয়ে উচ্চদরে সাইফকে কাজ দেওয়া হয়।
- ২০১৫ সালে সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে বছরের পর বছর সাইফকে এনসিটির চারটি জেটির দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারবিহীন পদ্ধতি।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সাইফ পাওয়ারটেকের ওপর ৫১৮ কোটি টাকা ঋণ বকেয়া রয়েছে, এবং সম্পত্তি নিলামের প্রক্রিয়া চলছে।
🔳বিদেশী অপারেটর: বৈশ্বিক চিত্র ও বাংলাদেশঃ
বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নতুন নয়। ডেনমার্কের "এপি মোলার" ৩৬টি দেশে, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫০টি টার্মিনালে এবং সিঙ্গাপুরের পোর্ট অথোরিটি ৪৫টি দেশে অপারেশন পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম বন্দরেও ইতিমধ্যে দুবাই, চীন ও ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠানগুলো টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর থাকা জরুরি।
🔳বিতর্কের মূল প্রশ্নঃ
১. বন্দর বিক্রি" নাকি স্বচ্ছতা?: সরকারের দাবি, এনসিটির টেন্ডার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানের ছিল এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো প্রতিষ্ঠান কার্যক্রমে দক্ষতা আনবে। অন্যদিকে, সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন: চুক্তির অর্থ ও মেয়াদসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে কি?
২. স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা: সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান কি এই দায়িত্ব নিতে সক্ষম? বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, "স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আর্থিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব রয়েছে।"
৩. রাজনৈতিক প্রভাব: সাইফ পাওয়ারটেকের সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের যোগসাজশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও, বিরোধী দলগুলি একে "রাজনৈতিক প্রতিহিংসা" বলে বর্ণনা করছে।
🔳পরবর্তী পদক্ষেপঃ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে সব ধরনি আইনি ও প্রশাসনিক যাচাই করা হবে। এনসিটির শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক শর্ত দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি কর্তৃপক্ষের।
🔳মূল্যায়নঃ
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, যা বছরে ৩০ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে। টার্মিনালগুলোর আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি হলেও, এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করাই হবে চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করে এবং দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে, তবে জনসাধারণের আস্থা ফিরে আসতে পারে।
তথ্যসূত্র: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ব্যাংক, দৈনিক প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ডিপি ওয়ার্ল্ডের ওয়েবসাইট।

Comments
Post a Comment