ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিতরা: রাষ্ট্রের অদৃশ্য সংকট

ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিতরা: রাষ্ট্রের অদৃশ্য সংকট


ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিতরা: রাষ্ট্রের অদৃশ্য সংকট

মোহাম্মদ উসমান গনি

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে বলছে, “প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ভোট প্রদানের অধিকারী।” কিন্তু বাস্তবে একটি বড় শ্রেণি নিয়মিতভাবে এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁরা শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকার কিংবা অন্যান্য নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা মানুষ। গণতন্ত্রের জন্য যাঁরা দিনভর পরিশ্রম করেন, নিজের ভোট দিতে গিয়ে তাঁরাই হন বঞ্চিত।

দায়িত্ব ও অধিকার: দ্বন্দ্বের বাস্তবতা

প্রতি নির্বাচনে প্রায় ৭-৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রত্যক্ষভাবে ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের অনেকে শিক্ষক, ব্যাংকার, বিভিন্ন সরকারি অফিসার বা মাঠ প্রশাসনের কর্মী। ভোটের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁদের দায়িত্ব থাকে অন্যের ভোট নিশ্চিত করা। কিন্তু নিজস্ব ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ তাঁদের থাকে না।

প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেন একজন নাগরিককে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার বিসর্জন দিতে হবে? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই প্রশ্ন শুধু নৈতিক নয়, বরং মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।

গণতন্ত্রের অপূর্ণতা

গণতন্ত্রের শক্তি অংশগ্রহণে। অথচ দায়িত্বশীল ও শিক্ষিত নাগরিকদের একটি বড় অংশ বারবার প্রক্রিয়া থেকে বাইরে থেকে যাচ্ছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন কিন্তু এই সমস্যার সমাধানে “Postal Ballot” বা ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থা রেখেছে, বিশেষত নিরাপত্তাকর্মী ও সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়ও একই সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে কেন এমন কোনো ব্যবস্থা নেই—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রযুক্তির সমাধান: ইভিএমের সুযোগ

বর্তমানে ইভিএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সহজ সমাধান পাওয়া সম্ভব। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য একটি বিশেষ ইভিএম রাখা যেতে পারে, যেখানে কেবল তাঁরাই ভোট দিতে পারবেন, নিজেদের এলাকার প্রার্থীর জন্য।

এমনকি যদি বাংলাদেশ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় যায়, তবে এটি আরও সহজ হয়ে উঠবে। তখন ভোটগণনা হবে জাতীয় তালিকা অনুযায়ী, আর দায়িত্ব পালনকারীরাও তাঁদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।

রাষ্ট্র ও কমিশনের করণীয়

এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে দুটি পথ খোলা—

  1. Postal Ballot বা আগাম ভোটের ব্যবস্থা চালু করা।
  2. বিশেষ ইভিএম বুথ স্থাপন করা।

দুই ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য হবে একটি—কাউকে যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না করা।


একজন শিক্ষক যখন হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন, কিংবা একজন ব্যাংকার যখন দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখেন, তখন তাঁর ভোটও সমানভাবে মূল্যবান। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের ভোটাধিকার হারানো কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।

আজকের দাবি একটাই—গণতন্ত্রকে পূর্ণাঙ্গ করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে, দায়িত্বে থাকা কোনো নাগরিক যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।

Comments

Popular posts from this blog

কাশ্মীরের ইতিহাস

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা