জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ: ন্যায়, মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার
মাননীয় সভাপতি মহোদয়, সম্মানিত দায়িত্বপ্রত্যাশী আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ ও সন্মানিত অতিথিবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম ও শুভ অপরাহ্ন।
সবার প্রথমে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে আমাকে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দেয়ায় ধন্যবাদ জানাই। এই গৌরবময় মঞ্চে আমি একান্তভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের কথা ও বার্তা বিশ্বের হৃদয়ের কাছে পৌঁছাবে।
এছাড়া, একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বর্ণিত রাজনৈতিক বাধাপ্রবণতা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় আমার বক্তৃতার প্রধান উপজীব্য।
ভাষণের কাঠামো ও মূল বিষয়সমূহ
আমি এখানে ভাষণকে কয়েকটি মৌলিক অংশে বিভাজন করে উপস্থাপন করছি:
- প্রারম্ভ ও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন
- জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয়তা: অর্জন ও সীমাবদ্ধতা
- বাংলাদেশে শুরু হওয়া সংস্কার, গণঅভ্যুত্থান ও আগামী নির্বাচন
- মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক চুক্তি
- অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থা সংস্কার
- রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
- বাণিজ্য, জলবায়ু ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
- শান্তি, পারমাণবিক নিষ্পত্তি ও গাজা ইস্যু
- উপসংহার ও আহ্বান
নিচে প্রতিটি অংশ সংক্ষেপে এবং প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করছি:
১. প্রারম্ভ ও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন
- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই; এর মাধ্যমে প্রথম নারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের গুরুত্ব অতুলনীয়।
- ৮০তম অধিবেশনের এই মাইলফলকে, সকল সদস্য রাষ্ট্রকে আমি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই।
- গত আট দশকে জাতিসংঘ যে মানবকল্যাণ, শান্তি ও ন্যায্যতার জন্য কাজ করেছে, তা বিশ্ববাসীর কাছে অনস্বীকার্য।
২. জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয়তা: অর্জন ও সীমাবদ্ধতা
- বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবাধিকার, দুর্যোগ সহায়তা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় জাতিসংঘ একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে।
- তবে, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট। কিছু ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক শক্তি-পোড় চুক্তি এবং রাজনৈতিক চাপ বহুপক্ষীয় কাঠামোগত সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে দিতে পারে।
- অতএব, বহুপক্ষীয়তা ও সংহতির মূল্য আমাদের অতীতের থেকে বেশি প্রয়োজন আজ।
৩. বাংলাদেশ: সংস্কার, গণঅভ্যুত্থান ও আগামী নির্বাচন
- চল্লিশ বছরের দীর্ঘ শাসনব্যবস্থা ও সংকটের পরে, আমরা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা দেখেছি — যুবতর শক্তি স্বৈরাচারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
- এই নতুন সূচনায়, আমরা ১১টি স্বাধীন সংস্কার কমিশন গড়ে তোলে সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেছি।
- জাতীয় ঐক্যমত্য গঠনের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দলকে অংশগ্রহণ করিয়ে, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
৪. মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক চুক্তি
- ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দিনের মধ্যেই, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই কমিশনারকে বাংলাদেশে তদন্ত কার্যক্রম করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
- আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
- বাংলাদেশ এখন নির্যাতনবিরোধী চুক্তি ও এর প্রোটোকলে সদস্য হয়েছে এবং গঠিত হয়েছে একটি স্বাধীন প্রতিরোধমূলক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
৫. অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থা সংস্কার
- রাজস্ব আহরণ ও কর ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কার हमने প্রণয়ন করেছি — স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে।
- মুদ্রানীতি উদারীকরণ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের রূপান্তর, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ডিজিটালায়ন, এবং বিনিয়োগ-বান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে।
- বাণিজ্য ও লগিস্টিকের উন্নয়ন, একীভূত ওয়ান-স্টপ সিস্টেম ও সেবা সহজীকরণ প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
६. রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
- আট বছরেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হয়নি। বাংলাদেশ বিশ্বকে বারবার আবেদন জানাচ্ছে এই সংকট মুক্তি পেতে।
- রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর জন্য তহবিলের সংকট রয়েছে, এবং এ তহবিল দ্রুত পূরণ করা না হলে মানবিক বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা দৃঢ়।
- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, দাতা দেশ, ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে আমি বিশেষ আহ্বান জানাই — মানবিক ও রাজনৈতিক সমাধানের জন্য তহবিল, সমঝোতা ও চাপ প্রয়োগে এগিয়ে আসুন।
৭. বাণিজ্য, জলবায়ু ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
- বিশ্ব বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্বায়নের সুফলকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
- বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তিতে দক্ষ – তাদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের এক ধাপ।
- জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় “Loss & Damage Fund” কার্যকর চালু করা এবং অভিযোজন উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
- উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নির্গমন ও দায়বদ্ধতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
৮. শান্তি, পারমাণবিক নিষ্পত্তি ও গাজা ইস্যু
- গাজায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর ওপর হানির ঘটনা অত্যন্ত নিন্দার বিষয়।
- পারমাণবিক অস্ত্র রোধ, শান্তি উত্থান এবং নিরস্ত্রকরণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করি।
- সংহতির ভিত্তিতে, শান্তিরক্ষা অভিযানে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একটি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
৯. উপসংহার ও আহ্বান
- পরিবর্তন ও ন্যায্যতার পথে এগিয়ে যেতে হলে, আমরা সকলকে — দেশী ও আন্তর্জাতিক — একসাথে কাজ করতে হবে।
- বহুপক্ষীয় কাঠামোর প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় রাখা জরুরি।
- “তিন শূণ্যের পৃথিবী” — শূন্য কার্বন, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ, শূন্য বেকারত্ব — এই অভিলাষে আমার আজকের ভাষণ শেষ করছি।
- আপনাদের সকালের শুভ কামনা ও ধন্যবাদ।

Comments
Post a Comment