BUET ও CUET: মেধার অপচয় নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা?

BUET ও CUET: মেধার অপচয় নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা?  BUET ও CUET: মেধার অপচয় নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা? ভূমিকা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (CUET)—এই দুই প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় দেশের সর্বোচ্চ মেধার আঁতুড়ঘর। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভেঙে অল্প ক’জন এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলে এই আশায় যে, তারাই হবে দেশের প্রযুক্তিগত মুক্তির অগ্রদূত।  কিন্তু কঠিন প্রশ্ন হলো—এই মেধা কি সত্যিই দেশ গঠনে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি এটি একটি সুপরিকল্পিত অপচয়ের নাম?  নির্মম বাস্তবতা: প্রযুক্তিতে আমরা এখনও পরনির্ভরশীল স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ আজও বাইসাইকেল, কৃষিযন্ত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, শিল্প যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে উচ্চপ্রযুক্তির সামান্য একটি স্ক্রু পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করতে বাধ্য।  যে দেশে BUET ও CUET-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে নিজস্ব শিল্পযন্ত্র, পরিবহন প্রযুক্তি বা মৌলিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের নজির কেন এত দুর্বল—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।  রাষ্ট্র বিনিয়োগ করে, কিন্তু প্রত্যাবর্তন পায় না সরকার একজন প্রকৌশলী তৈরি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে—ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষা, অবকাঠামো, শিক্ষক ও গবেষণা সুবিধা। অথচ গ্র্যাজুয়েশন শেষে সেই ইঞ্জিনিয়ারের বড় অংশ কাজ করেন ব্যাংক, বীমা বা কর্পোরেট সেলস প্রতিষ্ঠানে।  এটি ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। কারণ রাষ্ট্র কখনোই স্পষ্টভাবে বলে দেয়নি—এই মেধার কাছে দেশের প্রত্যাশা কী।  মেগা প্রকল্পে বিদেশ নির্ভরতা: লজ্জার বাস্তব চিত্র মেট্রোরেল, টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা এক্সপ্রেসওয়ে—দেশের প্রায় সব মেগা প্রকল্পেই মূল পরিকল্পনা, ডিজাইন ও কারিগরি সিদ্ধান্ত আসে বিদেশ থেকে। আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানে অনেক সময় কেবল বাস্তবায়নকারী বা তদারকির ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেন।  প্রশ্ন হলো—যদি দেশের সেরা ইঞ্জিনিয়াররাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় না থাকেন, তাহলে BUET-CUET আসলে কাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করছে?  বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল সার্টিফিকেট কারখানা? BUET ও CUET-এ গবেষণা হয়—কাগজে-কলমে। থিসিস, জার্নাল, সেমিনার হয় ঠিকই, কিন্তু সেই গবেষণার কয়টি বাস্তব শিল্পে প্রয়োগ হয়? কয়টি গবেষণা পণ্য, যন্ত্র বা প্রযুক্তিতে রূপ নেয়?  বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি বাস্তব সমস্যার সমাধান না দেয়, তাহলে তারা জ্ঞান তৈরি করছে নাকি শুধু ডিগ্রি বিতরণ করছে—সে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।  দায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয় অনেকে বলেন—"ইঞ্জিনিয়াররা দেশ ছেড়ে চলে যায়" বা "ব্যাংকে চাকরি নেয়"। কিন্তু কেন নেয়—সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ খোঁজে না।  গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নেই উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ নেই শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ প্রায় নেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গবেষণাভিত্তিক চাকরির কাঠামো নেই এই বাস্তবতায় একজন মেধাবী তরুণ কীভাবে ঝুঁকি নিয়ে উদ্ভাবনের পথে হাঁটবে?  কী হওয়া উচিত: কঠোর কিন্তু বাস্তবসম্মত প্রস্তাব এখন সময় এসেছে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার।  BUET ও CUET গ্র্যাজুয়েটদের জন্য জাতীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী ২–৩ বছর রাষ্ট্রীয় বা শিল্পভিত্তিক R&D-তে যুক্ত থাকার সুযোগ ও প্রণোদনা মেগা প্রকল্পে বিদেশি পরামর্শকের পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করা গবেষণা থেকে পণ্য তৈরির জন্য রাষ্ট্রীয় ফান্ড ও স্টার্টআপ সাপোর্ট উপসংহার BUET ও CUET ব্যর্থ নয়—ব্যর্থতা আমাদের ব্যবস্থায়। আমরা মেধা তৈরি করি, কিন্তু তাকে দিকনির্দেশনা দিই না। আমরা স্বপ্ন দেখি উন্নত দেশের, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব মেধাবীদের হাতে তুলে দিই না।  যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে BUET ও CUET কেবল মেধা রপ্তানির কারখানায় পরিণত হবে। আর যদি পরিবর্তন হয়—এই প্রতিষ্ঠানগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত মুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।


BUET ও CUET: মেধার অপচয় নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা?

ভূমিকা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (CUET)—এই দুই প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় দেশের সর্বোচ্চ মেধার আঁতুড়ঘর। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভেঙে অল্প ক’জন এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলে এই আশায় যে, তারাই হবে দেশের প্রযুক্তিগত মুক্তির অগ্রদূত।

কিন্তু কঠিন প্রশ্ন হলো—এই মেধা কি সত্যিই দেশ গঠনে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি এটি একটি সুপরিকল্পিত অপচয়ের নাম?

নির্মম বাস্তবতা: প্রযুক্তিতে আমরা এখনও পরনির্ভরশীল

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ আজও বাইসাইকেল, কৃষিযন্ত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, শিল্প যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে উচ্চপ্রযুক্তির সামান্য একটি স্ক্রু পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করতে বাধ্য।

যে দেশে BUET ও CUET-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে নিজস্ব শিল্পযন্ত্র, পরিবহন প্রযুক্তি বা মৌলিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের নজির কেন এত দুর্বল—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাষ্ট্র বিনিয়োগ করে, কিন্তু প্রত্যাবর্তন পায় না

সরকার একজন প্রকৌশলী তৈরি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে—ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষা, অবকাঠামো, শিক্ষক ও গবেষণা সুবিধা। অথচ গ্র্যাজুয়েশন শেষে সেই ইঞ্জিনিয়ারের বড় অংশ কাজ করেন ব্যাংক, বীমা বা কর্পোরেট সেলস প্রতিষ্ঠানে।

এটি ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। কারণ রাষ্ট্র কখনোই স্পষ্টভাবে বলে দেয়নি—এই মেধার কাছে দেশের প্রত্যাশা কী।

মেগা প্রকল্পে বিদেশ নির্ভরতা: লজ্জার বাস্তব চিত্র

মেট্রোরেল, টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা এক্সপ্রেসওয়ে—দেশের প্রায় সব মেগা প্রকল্পেই মূল পরিকল্পনা, ডিজাইন ও কারিগরি সিদ্ধান্ত আসে বিদেশ থেকে। আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানে অনেক সময় কেবল বাস্তবায়নকারী বা তদারকির ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেন।

প্রশ্ন হলো—যদি দেশের সেরা ইঞ্জিনিয়াররাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় না থাকেন, তাহলে BUET-CUET আসলে কাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করছে?

বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল সার্টিফিকেট কারখানা?

BUET ও CUET-এ গবেষণা হয়—কাগজে-কলমে। থিসিস, জার্নাল, সেমিনার হয় ঠিকই, কিন্তু সেই গবেষণার কয়টি বাস্তব শিল্পে প্রয়োগ হয়? কয়টি গবেষণা পণ্য, যন্ত্র বা প্রযুক্তিতে রূপ নেয়?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি বাস্তব সমস্যার সমাধান না দেয়, তাহলে তারা জ্ঞান তৈরি করছে নাকি শুধু ডিগ্রি বিতরণ করছে—সে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

দায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়

অনেকে বলেন—"ইঞ্জিনিয়াররা দেশ ছেড়ে চলে যায়" বা "ব্যাংকে চাকরি নেয়"। কিন্তু কেন নেয়—সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ খোঁজে না।

  • গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নেই
  • উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ নেই
  • শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ প্রায় নেই
  • রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গবেষণাভিত্তিক চাকরির কাঠামো নেই

এই বাস্তবতায় একজন মেধাবী তরুণ কীভাবে ঝুঁকি নিয়ে উদ্ভাবনের পথে হাঁটবে?

কী হওয়া উচিত: কঠোর কিন্তু বাস্তবসম্মত প্রস্তাব

এখন সময় এসেছে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

  • BUET ও CUET গ্র্যাজুয়েটদের জন্য জাতীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা
  • গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী ২–৩ বছর রাষ্ট্রীয় বা শিল্পভিত্তিক R&D-তে যুক্ত থাকার সুযোগ ও প্রণোদনা
  • মেগা প্রকল্পে বিদেশি পরামর্শকের পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করা
  • গবেষণা থেকে পণ্য তৈরির জন্য রাষ্ট্রীয় ফান্ড ও স্টার্টআপ সাপোর্ট

উপসংহার

BUET ও CUET ব্যর্থ নয়—ব্যর্থতা আমাদের ব্যবস্থায়। আমরা মেধা তৈরি করি, কিন্তু তাকে দিকনির্দেশনা দিই না। আমরা স্বপ্ন দেখি উন্নত দেশের, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব মেধাবীদের হাতে তুলে দিই না।

যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে BUET ও CUET কেবল মেধা রপ্তানির কারখানায় পরিণত হবে। আর যদি পরিবর্তন হয়—এই প্রতিষ্ঠানগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত মুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

Comments

Popular posts from this blog

কাশ্মীরের ইতিহাস

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা