উচ্চশিক্ষায় নিয়োগের নতুন ঢেউ: সংস্কার না পুরনো ধারায় প্রত্যাবর্তন?

 

উচ্চশিক্ষায় নিয়োগের নতুন ঢেউ: সংস্কার না পুরনো ধারায় প্রত্যাবর্তন?

উচ্চশিক্ষায় নিয়োগের নতুন ঢেউ: সংস্কার না পুরনো ধারায় প্রত্যাবর্তন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুদিন ধরেই একটি প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়ে আসছে—বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন গড়ে তোলার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কি সত্যিই আমরা দেখতে পাচ্ছি?

সম্প্রতি সরকার দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-এর চেয়ারম্যান পদেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিবর্তন কি সত্যিকার অর্থে সংস্কারের অংশ, নাকি এটি কেবলমাত্র ‘পুরাতন ধারার’ পুনরাবৃত্তি?

উচ্চশিক্ষা একটি জাতির বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড। এখানে নেতৃত্বের পদগুলো—বিশেষ করে উপাচার্য বা ইউজিসি চেয়ারম্যান—শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং নীতিনির্ধারণ, গবেষণার দিকনির্দেশনা এবং একাডেমিক পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদগুলোতে নিয়োগ যদি রাজনৈতিক আনুগত্য বা গোষ্ঠীগত বিবেচনায় হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতিই ডেকে আনে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন, ছাত্ররাজনীতির উত্তেজনা—এসব যেন এক পরিচিত চিত্র। ফলে ‘মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন’-এর যে স্বপ্ন দেখানো হয়, তা অনেক সময়ই বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না।

বর্তমান পরিবর্তনগুলোর ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কতটা উন্মুক্ত? প্রার্থীদের একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা অবদান এবং প্রশাসনিক দক্ষতা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? নাকি সিদ্ধান্তগুলো আগেই নির্ধারিত, এবং প্রক্রিয়াটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা?

যদি সরকার সত্যিই উচ্চশিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চায়, তাহলে কিছু মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি:

প্রথমত, উপাচার্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রার্থীদের যোগ্যতা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
তৃতীয়ত, নিয়োগের পর তাদের কর্মসম্পাদনের উপর নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

উচ্চশিক্ষা খাতকে যদি সত্যিই বিশ্বমানের দিকে এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে ‘পুরাতন ধারার’ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবন এবং নেতৃত্বের উৎস।

অতএব, বর্তমান নিয়োগগুলোকে কেবল প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে না দেখে, একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এটি কি সংস্কারের সূচনা, নাকি আবারও সেই পুরনো চক্রে ফিরে যাওয়া—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ।

Comments

Popular posts from this blog

কাশ্মীরের ইতিহাস

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা