বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে হয়ে যাওয়া চুক্তিতে কি আছে এবং কারা লাভবান

 
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি হলো পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (Agreement on Reciprocal Trade)।     এর আওতায় উভয় দেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রধান চুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:    📝 ১. পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মূল শর্তাবলি    ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে শুল্কহার, বাজার সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যে অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে :    · শুল্কহার নির্ধারণ:    · যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক হার (Reciprocal Tariff) ১৯% নির্ধারণ করেছে ।    · পাশাপাশি, নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের ওপর শূন্য শতাংশ (০%) শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা করবে তারা। তবে এই সুবিধা পেতে হলে পণ্যটিতে মার্কিন সুতা বা আঁশ ব্যবহার করতে হবে ।  · বাজার উন্মুক্তকরণ (বাংলাদেশ):    বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে, যেমন: রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, শক্তিপণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগির মাংস, ফলমূল ও বাদাম ।  · অ-শুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ:    · মার্কিন মান মেনে নেওয়া: বাংলাদেশ মার্কিন মোটরগাড়ির নিরাপত্তা ও নির্গমন মান মেনে নেবে। একইসঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের জন্য এফডিএ (FDA) অনুমোদন গ্রহণ করবে ।    · পণ্য আমদানি জটিলতা কমানো: যুক্তরাষ্ট্রের পুনঃনির্মিত পণ্য (Remanufactured Goods) আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে ।  · সরকারি ক্রয় ও বিনিয়োগ:    বাংলাদেশ তার জাতীয় বিমান সংস্থা বিমানের মাধ্যমে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি বিমান কেনার প্রক্রিয়া সহজতর করবে ।    পাশাপাশি, বাংলাদেশ মোট ১৮.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে:    · কৃষিপণ্য: প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার (গম, সয়াবিন, তুলা, ভুট্টা) ।    · শক্তিপণ্য (এলএনজি): ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার ।      যুক্তরাষ্ট্র এক্সিম ব্যাংক ও ডিএফসি-র মতো নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রযুক্তি, ও কৃষিখাতে বিনিয়োগে সহায়তা বিবেচনা করবে ।    🛡️ ২. প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সহযোগিতা    বাণিজ্যের পাশাপাশি সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে :    · প্রতিরক্ষা সামগ্রী কেনা: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করবে এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে এসব কেনা সীমিত করবে ।  · গোপনীয় তথ্য রক্ষায় চুক্তি (GSOMIA): উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সময় গোপন সামরিক তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে ।  · সেবা বিনিময় চুক্তি (ACSA): যুদ্ধকালীন বা জরুরি প্রয়োজনে পরস্পরকে খাবার, জ্বালানি, যানবাহন ও গোলাবারুদ সরবরাহের সুযোগ তৈরি করতে এই চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলছে ।  · রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবেদনশীল প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করবে ।  · পরমাণু জ্বালানি কেনায় নিষেধাজ্ঞা: চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেই সব দেশ থেকে পরমাণু জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে ।    ⚖️ ৩. আইন, শ্রম, পরিবেশ ও ডিজিটাল বাণিজ্য    বাণিজ্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আইন ও নীতিতেও বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ :    · শ্রম ও পরিবেশ:    বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন করে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করবে। একইসঙ্গে পরিবেশ আইন কার্যকর করবে ।  · বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (IPR):    বাংলাদেশ বৌদ্ধিক সম্পত্তি সুরক্ষায় কঠোর মানদণ্ড মেনে চলবে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করবে। বিশেষ করে, পনির ও মাংসের ক্ষেত্রে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ (GI) নিয়ে সমঝোতা হয়েছে ।  · ডিজিটাল ও ডাটা বাণিজ্য:    বাংলাদেশ ডিজিটাল পরিষেবায় বৈষম্যমূলক কর আরোপ করবে না এবং ব্যবসায়িক স্বার্থে আন্তর্জাতিক ডাটা স্থানান্তরের সুযোগ দেবে। শুল্ক বিভাগ ডিজিটালাইজ করা হবে ।  · দুর্নীতি দমন:    বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দুর্নীতি দমনের আইন জোরদার করবে বলে অঙ্গীকার করেছে ।  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি আমেরিকার জন্য বেশি লাভজনক এবং বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদী সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা বেশি বহন করতে পারে।    আসুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।    ✅ যুক্তরাষ্ট্র যাতে লাভবান হচ্ছে    যুক্তরাষ্ট্র মূলত বাংলাদেশের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করছে:    · বাজার উন্মুক্ত হয়েছে: চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৪,৫০০ ধরনের মার্কিন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে (যার বেশিরভাগই বর্তমানে আমদানি করা হয় না, ফলে ভবিষ্যতে বাজার তৈরি হবে)।  · পণ্য ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি, বার্ষিক ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন) এবং ১৪টি বোয়িং বিমান কিনতে হবে।  · সেনা সরঞ্জাম কেনা: বাংলাদেশকে মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করতে হবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনা সীমিত করতে হবে।  · সুতা রপ্তানি নিশ্চিত: বাংলাদেশি পোশাকে জিরো শুল্ক সুবিধা পেতে হলে মার্কিন সুতা ও আঁশ ব্যবহার বাধ্যতামূলক।    ⚠️ বাংলাদেশের সম্ভাব্য ৫টি বড় ক্ষতি    বিশেষজ্ঞরা প্রধানত ৫টি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যেখানে বাংলাদেশের ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি:    ১. রাজস্ব আয় ব্যাপক হ্রাসঃ    · চিন্তার বিষয়: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় ৪,৫০০ পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করছে।  · ক্ষতির পরিমাণ: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর মতে, শুধু চলতি অর্থবছরেই বাংলাদেশের কাস্টমস রাজস্ব কমতে পারে প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকা।    ২. পোশাক শিল্পের জন্য শর্ত কঠিনঃ    · শর্তের জটিলতা: চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন সুতা ও আঁশ ব্যবহার করলেই কেবল পোশাকে জিরো শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে।  · বাস্তবতা: বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ পোশাত চীন ও ভারতের সুতা ব্যবহার করে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল বদলানো কঠিন। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণের (to be specified volume) বেশি পণ্যে এই সুবিধা নাও পাওয়া যেতে পারে।    ৩. কৌশলগত সিদ্ধান্তে শৃঙ্খলঃ    · রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শঙ্কা: চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সেই সব দেশ থেকে পরমাণু জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য স্বার্থ’ ক্ষুণ্ণ করে। এতে রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি জটিলতার মুখে পড়তে পারে।  · কেনাকাটার স্বাধীনতা হ্রাস: বাংলাদেশকে অন্য দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।    ৪. স্থানীয় শিল্পের জন্য হুমকিঃ    · কারণ: হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্যে (যন্ত্রপাতি, কৃষি পণ্য, গাড়ি) শুল্ক ছাড় দেওয়ায় দেশীয় পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে। আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশের কৃষক বা ছোট শিল্প উদ্যোক্তারা এখনই সেই প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত নন।    ৫. ‘অসম’ চুক্তিঃ    · দায়িত্বের ভারসাম্যহীনতা: চুক্তিতে ‘Bangladesh shall’ (বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৩১ বার, যেখানে ‘US shall’ (যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য থাকবে) মাত্র ৬ বার উল্লেখ আছে। এটি স্পষ্টতই নির্দেশ করে বাংলাদেশের ওপর চাপ অনেক বেশি।    যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজায় প্রবেশ ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য পেলেও, বাংলাদেশকে এর বিনিময়ে রাজস্ব হারানো, পোশাক শিল্পে কঠিন শর্ত মেনে চলা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে নমনীয়তা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ এই চুক্তিটিকে নিঃশর্ত সমর্থনের চেয়ে পুনরায় মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি হলো পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (Agreement on Reciprocal Trade)। 


এর আওতায় উভয় দেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রধান চুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:


📝 ১. পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মূল শর্তাবলি


২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে শুল্কহার, বাজার সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যে অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে :


· শুল্কহার নির্ধারণ:

  · যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক হার (Reciprocal Tariff) ১৯% নির্ধারণ করেছে ।

  · পাশাপাশি, নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের ওপর শূন্য শতাংশ (০%) শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা করবে তারা। তবে এই সুবিধা পেতে হলে পণ্যটিতে মার্কিন সুতা বা আঁশ ব্যবহার করতে হবে ।

· বাজার উন্মুক্তকরণ (বাংলাদেশ):

  বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে, যেমন: রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, শক্তিপণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগির মাংস, ফলমূল ও বাদাম ।

· অ-শুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ:

  · মার্কিন মান মেনে নেওয়া: বাংলাদেশ মার্কিন মোটরগাড়ির নিরাপত্তা ও নির্গমন মান মেনে নেবে। একইসঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের জন্য এফডিএ (FDA) অনুমোদন গ্রহণ করবে ।

  · পণ্য আমদানি জটিলতা কমানো: যুক্তরাষ্ট্রের পুনঃনির্মিত পণ্য (Remanufactured Goods) আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে ।

· সরকারি ক্রয় ও বিনিয়োগ:

  বাংলাদেশ তার জাতীয় বিমান সংস্থা বিমানের মাধ্যমে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি বিমান কেনার প্রক্রিয়া সহজতর করবে ।

  পাশাপাশি, বাংলাদেশ মোট ১৮.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে:

  · কৃষিপণ্য: প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার (গম, সয়াবিন, তুলা, ভুট্টা) ।

  · শক্তিপণ্য (এলএনজি): ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার ।

    যুক্তরাষ্ট্র এক্সিম ব্যাংক ও ডিএফসি-র মতো নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রযুক্তি, ও কৃষিখাতে বিনিয়োগে সহায়তা বিবেচনা করবে ।


🛡️ ২. প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সহযোগিতা


বাণিজ্যের পাশাপাশি সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে :


· প্রতিরক্ষা সামগ্রী কেনা: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করবে এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে এসব কেনা সীমিত করবে ।

· গোপনীয় তথ্য রক্ষায় চুক্তি (GSOMIA): উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সময় গোপন সামরিক তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে ।

· সেবা বিনিময় চুক্তি (ACSA): যুদ্ধকালীন বা জরুরি প্রয়োজনে পরস্পরকে খাবার, জ্বালানি, যানবাহন ও গোলাবারুদ সরবরাহের সুযোগ তৈরি করতে এই চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলছে ।

· রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবেদনশীল প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করবে ।

· পরমাণু জ্বালানি কেনায় নিষেধাজ্ঞা: চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেই সব দেশ থেকে পরমাণু জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে ।


⚖️ ৩. আইন, শ্রম, পরিবেশ ও ডিজিটাল বাণিজ্য


বাণিজ্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আইন ও নীতিতেও বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ :


· শ্রম ও পরিবেশ:

  বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন করে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করবে। একইসঙ্গে পরিবেশ আইন কার্যকর করবে ।

· বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (IPR):

  বাংলাদেশ বৌদ্ধিক সম্পত্তি সুরক্ষায় কঠোর মানদণ্ড মেনে চলবে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করবে। বিশেষ করে, পনির ও মাংসের ক্ষেত্রে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ (GI) নিয়ে সমঝোতা হয়েছে ।

· ডিজিটাল ও ডাটা বাণিজ্য:

  বাংলাদেশ ডিজিটাল পরিষেবায় বৈষম্যমূলক কর আরোপ করবে না এবং ব্যবসায়িক স্বার্থে আন্তর্জাতিক ডাটা স্থানান্তরের সুযোগ দেবে। শুল্ক বিভাগ ডিজিটালাইজ করা হবে ।

· দুর্নীতি দমন:

  বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দুর্নীতি দমনের আইন জোরদার করবে বলে অঙ্গীকার করেছে ।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি আমেরিকার জন্য বেশি লাভজনক এবং বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদী সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা বেশি বহন করতে পারে।


আসুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।


✅ যুক্তরাষ্ট্র যাতে লাভবান হচ্ছে


যুক্তরাষ্ট্র মূলত বাংলাদেশের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করছে:


· বাজার উন্মুক্ত হয়েছে: চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৪,৫০০ ধরনের মার্কিন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে (যার বেশিরভাগই বর্তমানে আমদানি করা হয় না, ফলে ভবিষ্যতে বাজার তৈরি হবে)।

· পণ্য ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি, বার্ষিক ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন) এবং ১৪টি বোয়িং বিমান কিনতে হবে।

· সেনা সরঞ্জাম কেনা: বাংলাদেশকে মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করতে হবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনা সীমিত করতে হবে।

· সুতা রপ্তানি নিশ্চিত: বাংলাদেশি পোশাকে জিরো শুল্ক সুবিধা পেতে হলে মার্কিন সুতা ও আঁশ ব্যবহার বাধ্যতামূলক।


⚠️ বাংলাদেশের সম্ভাব্য ৫টি বড় ক্ষতি


বিশেষজ্ঞরা প্রধানত ৫টি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যেখানে বাংলাদেশের ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি:


১. রাজস্ব আয় ব্যাপক হ্রাসঃ


· চিন্তার বিষয়: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় ৪,৫০০ পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করছে।

· ক্ষতির পরিমাণ: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর মতে, শুধু চলতি অর্থবছরেই বাংলাদেশের কাস্টমস রাজস্ব কমতে পারে প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকা।


২. পোশাক শিল্পের জন্য শর্ত কঠিনঃ


· শর্তের জটিলতা: চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন সুতা ও আঁশ ব্যবহার করলেই কেবল পোশাকে জিরো শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে।

· বাস্তবতা: বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ পোশাত চীন ও ভারতের সুতা ব্যবহার করে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল বদলানো কঠিন। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণের (to be specified volume) বেশি পণ্যে এই সুবিধা নাও পাওয়া যেতে পারে।


৩. কৌশলগত সিদ্ধান্তে শৃঙ্খলঃ


· রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শঙ্কা: চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সেই সব দেশ থেকে পরমাণু জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য স্বার্থ’ ক্ষুণ্ণ করে। এতে রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি জটিলতার মুখে পড়তে পারে।

· কেনাকাটার স্বাধীনতা হ্রাস: বাংলাদেশকে অন্য দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।


৪. স্থানীয় শিল্পের জন্য হুমকিঃ


· কারণ: হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্যে (যন্ত্রপাতি, কৃষি পণ্য, গাড়ি) শুল্ক ছাড় দেওয়ায় দেশীয় পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে। আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশের কৃষক বা ছোট শিল্প উদ্যোক্তারা এখনই সেই প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত নন।


৫. ‘অসম’ চুক্তিঃ


· দায়িত্বের ভারসাম্যহীনতা: চুক্তিতে ‘Bangladesh shall’ (বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৩১ বার, যেখানে ‘US shall’ (যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য থাকবে) মাত্র ৬ বার উল্লেখ আছে। এটি স্পষ্টতই নির্দেশ করে বাংলাদেশের ওপর চাপ অনেক বেশি।


যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজায় প্রবেশ ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য পেলেও, বাংলাদেশকে এর বিনিময়ে রাজস্ব হারানো, পোশাক শিল্পে কঠিন শর্ত মেনে চলা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে নমনীয়তা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ এই চুক্তিটিকে নিঃশর্ত সমর্থনের চেয়ে পুনরায় মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

Comments

Popular posts from this blog

বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির ইতিহাস

মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যাঁরা

কাশ্মীরের ইতিহাস