৫৪ বছর পর সাগর পেরিয়ে ফেরা: হাতিয়ার ছৈয়দ আহম্মদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প
৫৪ বছর পর সাগর পেরিয়ে ফেরা: হাতিয়ার ছৈয়দ আহম্মদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প
জীবন কখনো কখনো এমন বাস্তব গল্প লিখে, যা রূপকথাকেও হার মানায়। নোয়াখালীর হাতিয়ার লক্ষ্মীদিয়া গ্রামের ছৈয়দ আহম্মদের জীবন যেন তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়—যিনি ৫৪ বছর আগে জাহাজডুবিতে নিখোঁজ হয়েছিলেন, আর পরিবার তাঁকে মৃত ভেবেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছিল। অথচ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর, বয়স যখন ৮৩, তখন তিনি ফিরে এলেন নিজের জন্মভিটায়।
তরুণ বয়সে ঘর ছেড়ে, সাগরে হারিয়ে যাওয়া
ছৈয়দ আহম্মদ ছিলেন চট্টগ্রামের একটি কার্গো জাহাজের শ্রমিক। জীবিকার তাগিদে স্ত্রী ও মাত্র চার মাস বয়সী একমাত্র ছেলে নূর হোসেনকে রেখে পাড়ি জমিয়েছিলেন কর্মজীবনে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপকূলের কাছে ভয়াবহ ঝড়ে জাহাজডুবির পর তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।
পরিবার, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পুরো গ্রাম ধরে নিয়েছিল—তিনি আর বেঁচে নেই।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে, অন্য দেশে নতুন জীবন
ছৈয়দ আহম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজডুবির পর দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার পর তাঁকে উদ্ধার করে ভারতীয় নৌবাহিনী। চিকিৎসার পর তিনি ভারতে থেকে যান। জীবনের দীর্ঘ ৫৪ বছর কাটে ভারতের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে আজমির শরিফ ও আগ্রা অঞ্চলে।
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্টও পান। কিন্তু বয়সের ভারে ন্যুব্জ একসময় স্বপ্নে ছেলেকে দেখেন। সেই স্বপ্নই যেন তাঁকে নাড়া দেয়—ফিরতে হবে নিজের মাটিতে, নিজের রক্তের টানে।
স্বপ্নের টানে দেশে ফেরা
কাগজপত্র হারিয়েও থেমে যাননি তিনি। যশোর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বিজিবির সহায়তায় ঢাকায় আসেন, সেখান থেকে নোয়াখালী, তারপর নদী পেরিয়ে হাতিয়ার লক্ষ্মীদিয়ায় পৌঁছান।
গ্রামের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে যখন তিনি নিজের পরিচয় দেন—হিন্দি আর ভাঙা বাংলায়—তখন প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু পরিবারের পুরোনো স্মৃতি, নাম-পরিচয় আর অতীতের নানা তথ্য মিলিয়ে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়—এই বৃদ্ধই সেই বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ছৈয়দ আহম্মদ।
একমাত্র ছেলে বাবাকে ৫৫ বয়সে এসে বাবাকে পেয়ে আবেগে জড়িয়ে ধরেন বাবাকে
বাবাকে প্রথমবার দেখা ছেলের অনুভূতি
ছেলে নূর হোসেনের বয়স এখন ৫৫। জন্মের পর বাবাকে কখনো দেখেননি। তাঁর স্মৃতিতে বাবার কোনো চেহারা নেই।
নূর হোসেনের ভাষায়:
“জন্মের পর কখনো বাবাকে দেখিনি। এখন তিনি ফিরে এসেছেন, এটা বিশ্বাসই হচ্ছে না।”
একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আর কী হতে পারে—যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রথমবার বাবাকে দেখতে পাওয়া যায়।
আনন্দের মাঝেও পারিবারিক টানাপোড়েন
এই অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের মাঝেও দেখা দিয়েছে পারিবারিক জটিলতা। নূর হোসেন অভিযোগ করেছেন, তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা বাবাকে নিজেদের কাছে রেখেছেন এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বাধা দিচ্ছেন। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন।
ভাষা ভুলে গেলেও ভুলেননি শিকড়
দীর্ঘ ৫৪ বছর দেশের বাইরে থাকার কারণে ছৈয়দ আহম্মদ নিজের মাতৃভাষার অনেকটাই ভুলে গেছেন। বেশিরভাগ কথা বলেন হিন্দিতে। কিন্তু ভাষা বদলেছে, সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে—তবুও মুছে যায়নি জন্মভূমির টান।
এই গল্প আমাদের কী শেখায়?
ছৈয়দ আহম্মদের জীবনের এই অধ্যায় শুধু হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের ফিরে আসার গল্প নয়; এটি শিকড়, পরিবার, স্মৃতি এবং মানবিক বন্ধনের এক অনন্য দলিল।
জীবন যত দূরেই নিয়ে যাক, মানুষ শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে চায় নিজের ঠিকানায়—নিজের মানুষদের কাছে।
শেষকথা
৫৪ বছর পর ফিরে আসা ছৈয়দ আহম্মদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আশা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। কখনো কখনো জীবন এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হয়, যা প্রমাণ করে—সময়ের চেয়েও শক্তিশালী হলো মানুষের সম্পর্ক, রক্তের টান, আর জন্মভূমির ডাক।


Comments
Post a Comment