বারবার পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন: শিক্ষা উন্নয়ন নাকি নীতিগত অস্থিরতা?
বারবার পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন: শিক্ষা উন্নয়ন নাকি নীতিগত অস্থিরতা?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু গত দুই দশকে পাঠ্যবই, শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীল কাঠামোর বদলে পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছে—যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সামগ্রিকভাবে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে।
২০০১ সালের পর থেকে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন একেবারে নতুন নয়, তবে ২০০১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পরিচয়, এমনকি মূল্যবোধভিত্তিক বিষয়বস্তুর পুনর্লিখন দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।
এক সরকার যে বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে, পরবর্তী সরকার তা সংশোধন বা প্রতিস্থাপন করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক জ্ঞান নয়, বরং রাজনৈতিক দর্শননির্ভর সংস্করণের মধ্যে বড় হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি কার?
শিক্ষার্থী:
- একেক ব্যাচ একেক পদ্ধতিতে পড়ছে
- বোর্ড পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বিভ্রান্তি
- মৌলিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট
শিক্ষক:
- নতুন কারিকুলাম বুঝতে প্রশিক্ষণের চাপ
- বাস্তব প্রস্তুতি ছাড়া শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগের বাধ্যবাধকতা
- মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলে যাওয়ায় পেশাগত অনিশ্চয়তা
অভিভাবক:
- সন্তানকে সহায়তা করতে গিয়ে নতুন পদ্ধতিতে বিভ্রান্তি
- কোচিং, গাইড, সহায়ক বইয়ের অতিরিক্ত ব্যয়
- ভবিষ্যৎ শিক্ষা কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দুর্নীতির ঝুঁকি
প্রতি বছর কোটি কোটি নতুন বই ছাপানো, বিতরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম ওয়ার্কশপ, পরামর্শক নিয়োগ—সব মিলিয়ে এটি হাজার কোটি টাকার খাত।
প্রশ্ন হচ্ছে:
এই পরিবর্তনগুলো কতটা গবেষণাভিত্তিক, আর কতটা প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত?
বিশেষজ্ঞদের মতে—যদি একটি কার্যকর শিক্ষানীতি ১৫-২০ বছরের জন্য স্থির না থাকে, তবে ঘন ঘন পরিবর্তন শুধু বাজেট বাড়ায় না, বরং:
- মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধি করে
- পুরোনো বই বাতিল করে অপচয় বাড়ায়
- প্রশিক্ষণ খাতে অস্বচ্ছতা তৈরি করে
- নীতিনির্ধারণে জবাবদিহিতা কমায়
শিক্ষার মান কেন নিচে নামছে?
বাংলাদেশে বহু শিক্ষার্থী এখনও পাঠ-অনুধাবন, গণিত দক্ষতা ও বিশ্লেষণী সক্ষমতায় আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে।
কারণ হিসেবে দেখা যায়:
- নীতির ধারাবাহিকতার অভাব
- পরীক্ষামূলক কারিকুলাম
- বাস্তবভিত্তিক শিক্ষক প্রস্তুতির ঘাটতি
- শহর-গ্রাম বৈষম্য
- রাজনৈতিক প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাস্তবতা কী বলে?
ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে শিক্ষানীতি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে যায় না। সেখানে জাতীয় শিক্ষা কমিশন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ করে।
বাংলাদেশেও প্রয়োজন:
একটি স্বাধীন, বিশেষজ্ঞনির্ভর, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জাতীয় শিক্ষা কমিশন
করণীয়:
- কমপক্ষে ১০-১৫ বছরের স্থিতিশীল শিক্ষানীতি
- পাঠ্যবই পরিবর্তনের আগে পাইলট প্রকল্প
- শিক্ষক প্রশিক্ষণে বাস্তব সক্ষমতা যাচাই
- ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা
- বাজেট ব্যয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও অডিট
উপসংহার
শিক্ষা কোনো সরকারের রাজনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি জাতি গঠনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বারবার পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন যদি গবেষণা, বাস্তবতা ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে না হয়, তবে তা শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে বরং বিভ্রান্ত, ব্যয়বহুল ও দুর্বল করে তোলে।
আজ প্রয়োজন নতুন বই নয়—প্রয়োজন স্থিতিশীল, বিজ্ঞানভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
কারণ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা নয়—দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাই হওয়া উচিত জাতির অগ্রাধিকারের বিষয়।
১১ মে ২০২৬ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ


Comments
Post a Comment