কোরবানি
⁉️কোরবানি কী?
কোরবানি (উধহিয়া) হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট পশু জবাই করে ইবাদত করা। "কোরবানি" শব্দটি আরবি কুরব (নৈকট্য) থেকে এসেছে, যার অর্থ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কোরবানি কর।”
সূরা আল-কাওসার, আয়াত: ২
⁉️কোরবানি কখন থেকে শুরু হয়েছে?
কোরবানির ইতিহাস মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই।
হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্রের কোরবানি
পবিত্র কোরআনে হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাদের উভয়কেই কোরবানি করতে বলা হয়েছিল। হাবিলের কোরবানি আল্লাহ কবুল করেন, কিন্তু কাবিলের কোরবানি কবুল হয়নি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহ তো শুধু মুত্তাকীদের (পরহেজগারদের) পক্ষ থেকেই গ্রহণ করেন।”
সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ২৭
এ থেকে বোঝা যায়, কোরবানি আদিকাল থেকেই আল্লাহর ইবাদতের একটি মাধ্যম।
⁉️বর্তমান কোরবানির প্রেক্ষাপট কী?
বর্তমান মুসলিম উম্মাহর কোরবানি মূলত হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে পালিত হয়।
আল্লাহ তাআলা স্বপ্নে ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। উভয়েই আল্লাহর আদেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেন। যখন তিনি পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন।
এই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে:
“হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি...”
সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২-১০৭
⁉️কাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব?
নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ হলে কোরবানি ওয়াজিব হয় (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী):
১. মুসলিম হতে হবে।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
৩. সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে।
৪. মুকিম (মুসাফির নয়) হতে হবে।
৫. প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে।
⁉️নিসাব কত?
সাড়ে ৭ ভরি (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম) রৌপ্যের মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়।
কোরবানি করার সময়
কোরবানির সময়:
✅১০ জিলহজ (ঈদের দিন)
✅১১ জিলহজ
✅১২ জিলহজ
ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করলে তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করেছে, সে যেন নিজের জন্য গোশত প্রস্তুত করেছে; কোরবানি আদায় হয়নি।”
সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫৫৪৫
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৬১
⁉️কোরবানির জন্য কোন পশু বৈধ?
✅উট (৫ বছর পূর্ণ)
✅গরু/মহিষ (২ বছর পূর্ণ)
✅ছাগল/ভেড়া/দুম্বা (১ বছর পূর্ণ)
পশু হতে হবে:
✅সুস্থ
✅অন্ধ নয়
✅খোঁড়া নয়
✅অতিরিক্ত রোগাক্রান্ত নয়
✅অত্যন্ত দুর্বল নয়
এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে:
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ২৮০২
জামে তিরমিযী, হাদীস নং: ১৪৯৭
কোরবানি করার সঠিক পদ্ধতিঃ
১. কিবলামুখী করে পশু শোয়ানো।
২. "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলা।
৩. ধারালো ছুরি ব্যবহার করা।
৪. দ্রুত জবাই করা।
৫. শ্বাসনালী, খাদ্যনালী ও প্রধান দুই রক্তনালী কাটা।
৬. পশুকে কষ্ট না দেওয়া।
জবাইয়ের সময় দোয়া:
> بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ
অর্থ: “আল্লাহর নামে, আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“তোমরা যখন জবাই করবে, তখন উত্তমভাবে জবাই করো এবং ছুরি ধারালো করে নাও।”
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৫৫
⁉️ভাগে কোরবানি করার নিয়ম
✅গরু, মহিষ ও উট
সর্বোচ্চ ৭ জন পর্যন্ত শরিক হতে পারবেন।
প্রত্যেকের নিয়ত অবশ্যই কোরবানি বা বৈধ ইবাদতের হতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে হুদাইবিয়ায় একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছি।”
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩১৮
জামে তিরমিযী, হাদীস নং: ৯০৫
✅ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা
একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি হবে।
ভাগে কোরবানি করা যাবে না।
গোশত বণ্টনের নিয়মঃ
মুস্তাহাব হলো:
✅১/৩ নিজের জন্য
✅১/৩ আত্মীয়-স্বজনের জন্য
✅১/৩ গরিব-মিসকিনের জন্য
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রকে খাওয়াও।”
সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ২৮
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করলে কী হবে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যার সামর্থ্য আছে, কিন্তু সে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।”
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ৩১২৩
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করা গুনাহ। পরে তওবা করতে হবে এবং কোরবানির পশুর মূল্য সদকা করার বিধান উল্লেখ করেছেন অনেক ফকিহ।
কোরবানির মূল শিক্ষা
১. আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য।
২. ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মানসিকতা।
৩. তাকওয়া অর্জন।
৪. দরিদ্রদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা।
৫. সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৭
সুতরাং কোরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা এবং তাকওয়া অর্জন।
লেখক ও গবেষককঃ
মোহাম্মদ ওসমান গনি সাগর
বিবিএস (অনার্স); এমবিএস; এমবিএ

Comments
Post a Comment